August 6, 2020, 12:23 pm
সংবাদ শিরোনাম :
পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু নিজেকে সফল দাবি: মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন ‘দুলাভাইয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক দেখায় মাকে গলাকেটে হত্যা’ শারীরিক উপস্থিতিতে অধস্তন আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শুরু আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিরা বিসিসিআইয়ের সব নিয়ম মানতে নারাজ বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন কাঁদছে লেবাননের শোকে আবারো স্বর্ণের দাম প্রতি ভরিতে বেড়েছে ৪ হাজার ৫৩২ টাকা সাবরিনা-আরিফসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট বাংলাদেশকে ৩২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেবে জাপান করোনা মোকাবিলায় নৌকাডুবে ১৭ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ ২ করোনায় মৌলভীবাজারে চায়ের নিলামে মিলছে না ক্রেতা রাফায়েল নাদাল ইউএস ওপেন থেকে নিজের নাম প্রত্যার করলেন ভারতের অযোধ্যায় আলোচিত রামমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন আজ আগ্নেয়াস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার আমদানি-রপ্তানি শুরু সোনামসজিদ স্থলবন্দরে সিনহা’র মৃত্যুর ঘটনার প্রভাবমুক্ত তদন্ত হবে: আইজিপি সিনহা’র মৃত্যুর দায় ব্যক্তির, কোন প্রতিষ্ঠানের নয়’ জুয়া খেলা নিয়ে সংঘর্ষে নিহত এক, আটক চার আজ থেকে আবারো শুরু হচ্ছে ইউরোপা লিগ ‘পোর্টাল নিবন্ধন চলমান প্রক্রিয়া, তালিকাভুক্ত হবে যোগ্যরাই’

দাম্পত্যের সুধা

আজমেরিনা শাহানী:

সৃষ্টির শুরু থেকেই স্রষ্টা নারী ও পুরুষকে একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে নিরুপণ করেছেন। নারী-পুরুষ দুজনকে নিয়েই গড়ে ওঠে একটি পূর্নাঙ্গ, শাশ্বত, সামাজিক ও স্বর্গীয় জীবন তা হলো ‘দাম্পত্য জীবন’। ‘দাম্পত্য’ ভীষণ মধুর একটি শব্দ। প্রতিটি মানুষের কাছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো এ দাম্পত্য, যা স্রষ্টার পক্ষ থেকে নেমে আসে এক চরম আশীর্বাদ হয়ে। বিবাহ নামক এক পবিত্র বন্ধনের মাধ্যমে যে দাম্পত্যের সূচনা, তাকে শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আর নিরন্তর সমঝোতা দিয়ে অটুট ও আমৃত্যু স্থায়ী করে রাখাটা তাই ভীষণ জরুরী।

কেননা, এই দাম্পত্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে এক অনাবিল প্রশান্তি ও চরম পরিতৃপ্তির সুধা, যদিও বিয়ে ও দাম্পত্য নিয়ে অনেক মনীষীর মধ্যেই অনেক মতবিরোধ রয়েছে। বিখ্যত মনীষী মাদ সোয়াজেন বলেছেন- “বিবাহ একটি জুয়া খেলা, পুরুষ বাজি রাখে স্বাধীনতা আর নারী বাজি রাখে সুখ”। আরেক মনীষী শুপেন হাওয়ার বলেছেন- “বিয়ে করার অর্থ হচ্ছে নিজের অধিকারের অর্ধেক করে নেওয়া এবং কর্তব্য কে দ্বিগুন করে নেওয়া”।

তবে, বিবাহ ও দাম্পত্য নিয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন বার্ট্রান্ড রাসেল। তাঁর মতে, “বিবাহ হচ্ছে নারীর জন্য খুব সাধারণ একটা জীবিকা। সম্ভবত, এক্ষেত্রে অনিচ্ছা সত্ত্বেও যৌন কর্মের পরিমাণ পতিতাবৃত্তির চেয়ে বেশি”। তবে, এতো ইতিবাচক, নেতিবাচক ও বিতর্কিত মন্তব্যকে অবলীলায় অতিক্রম করেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর ভাষায়, “লোকে ভুলে যায় দাম্পত্যটা একটা আর্ট, প্রতিদিন ওকে নূতন করে সৃষ্টি করা চাই”। সত্যিই, দাম্পত্য একটি শিল্প। ভালোবাসার বৈচিত্রময় রঙ দিয়ে নানারূপে তাকে নিত্য সমৃদ্ধ করতে হয়।

পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, পরম শ্রদ্ধা ও নির্ভরতার চাদরে তাকে মুড়িয়ে রাখতে হয়। একে অপরের কাছে ‘জামানত’ রাখতে হয় ‘দুটি হৃদয়’। তবেই না দাম্পত্যকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করা সম্ভব। মানুষের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন ও সমাজ জীবনে ‘দাম্পত্য’ সম্পর্কের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দাম্পত্যকে কেন্দ্র করেই সংসার নামক একটা পার্লামেন্ট গড়ে ওঠে।

সেখানে বসবাসরত সকল সদস্যদের সুখ-শান্তির নিশ্চয়তা এর উপর নির্ভর করে। তাই, দাম্পত্য জীবন সুখের না হলে জীবনে নেমে আসতে পারে নারকীয় অভিশাপ। সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম কিছু ভুল ও অনাকাঙ্খিত আচরণের জন্য সম্পর্কের মধ্যে জন্ম নেয় এক চরম তিক্ততা। তীব্র সুখের আকাঙ্খায় জীবনের চক্র শুরু হলেও, কেন্দ্রীভূত থাকে না আর স্বপ্নগুলো। অক্ষত থাকে না বুকের পাঁজর। বিন্দু বিন্দু ভুল বোঝাবুঝি গুলো এক সময় মহাসমুদ্রে রূপ নেয়। আর তখনই সম্পর্ক রূপ নেয় ডির্ভোস নামের এক অভিশপ্ত পরিণয়ে। কিন্তু, পৃথিবীর কোন সুস্থ সমাজ ও সংস্কৃতি এই সেপারেশনকে সমর্থন করে না।

দুটি মানুষের এই আত্মিক বন্ধন ছিন্নতার হাত ধরেই তাদের সন্তান-সন্তানাদিরা ব্রোকেন ফ্যামেলি নামক এক দুঃস্বপ্নের মহাসাগরে ডুবে যেতে থাকে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা নিতান্ত অসহায়ের মতো সাক্ষী থাকে এমন এক ঘটনার। পশ্চিমা বিশ্বের মত বর্তমানে আমাদের এই ঘুণে ধরা নাগরিক সভ্যতায় বিচ্ছেদের ব্যাপকতা মারাত্মক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

জার্মানির প্রধান সংবাদ মাধ্যম ‘ডয়েচে ভেলে’ এর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের দুটি এলাকায় ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তালাক কার্যকর হয় ২৩০৯ টি। এর মধ্যে ১৩৮৪ টি স্ত্রী কর্তৃক এবং ৯২৫ টি স্বামী কর্তৃক। এছাড়া, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত তালাকের সংখ্যা ৩৫৮৯ টি। এর মধ্যে ২৩৮১ টি স্ত্রী কর্তৃক এবং ১২০৮ টি স্বামী কর্তৃক। এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তালাক দেয় নারী ৭০% এবং পুরুষ ৩০%।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ৬ বছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে অর্ধ লাখের বেশি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে। এই হিসাবে মাসে গড়ে ৭৩৬ টি, দিনে ২৪ টির বেশি ও প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ১ টি তালাকের ঘটনা ঘটছে। ডিভোর্সের আবেদনে নারীরা এগিয়ে এটা মোটেও কাম্য নয়। কারণ, ভাঙনের জন্য কোন সম্পর্কের জন্ম হয় না। একটি সংসার যখন হয়, তখন নারী পুরুষ দুইজনই মিউচুয়ালি কমিটেড থাকে। কাজেই, পুরুষের সহিংসতা বেশি হয় বলেই তো নারীরা ডিভোর্স দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া, স্বাবলম্বীতা ও আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকায় একজন নারী এখন তার পরিবারকেও আর্থিক ভাবে সাহায্য করতে পারছে।

পারিবারিক বন্ধনের চেয়েও অনেক নারী নিজের পেশা জীবনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। আর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ফলে নারী নিজেই এখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তবে, আরও যেসব কারণে ডিভোর্সের মত এমন অনাকাঙ্খিত ও অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ব্যক্তিত্বের সংঘাত, নেতিবাচক মনোভাব, সঙ্গীকে প্রাধ্যান্য না দেওয়া ও হেয় প্রতিপন্ন করা, অসততা, পরকীয়া, একে অন্যের প্রতি আকর্ষণ ফুরিয়ে যাওয়া, শারীরিক ঘনিষ্টতার অভাব, আর্থিক সমস্যা, পরিবারের সদস্যদের বৈরী আচরণ, সম্পর্কের পরিচর্যার অভাব, যৌতুক ও স্ত্রী বন্ধাত্ব সহ নানা রকম অনাকাঙ্খিত বিষয়।

এছাড়া, নারীদের মধ্যে শিক্ষার হার বৃদ্ধির কারণে আগের চেয়েও বেশি সচেতনতা ও স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা আইনি অধিকার সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা রাখছে। ফলে তারা নীরবে আর কোন অত্যাচার মেনে নিতে চাইছে না।

বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে সন্তানদের উপর। তারা বেড়ে উঠছে ব্রোকেন ফ্যামেলির সন্তান হিসেবে। এমন পরিস্থিতিতে তারা এক ধরনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভোগে। সন্তানরা যদি বাবা-মায়ের ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে তাদের জীবন হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক ও দুর্বিষহ। তারা সমাজ ও পরিবারকে, নেতিবাচক হিসেবেই দেখতে শেখে, তাদের মধ্যে জীবন বিমুখিতা তৈরি হয়, যা ভয়াবহ।

তাই, বিবাহ বিচ্ছদের কথা মস্তিষ্ক থেকে দূরে রেখে সন্তান সন্তানাদিসহ একটি পরিপূর্ণ সুখী দাম্পত্য জীবন উপভোগ করতে হলে পরিণয়ের শুরু থেকেই স্বামী ও স্ত্রী উভয়কেই কিছু নিয়ম নীতি মেনে চলতে হবে। আত্মিক সম্পর্ককে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হলে পারষ্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আস্থা অর্জন করতে হবে, একে অপরের প্রতি আন্তরিক হতে হবে, বিনয়ী, নমনীয়, ধৈর্য্যশীল ও সহনশীল হতে হবে, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, একে অন্যকে ক্ষমা করা ও বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে, দায়িত্বশীলতার সাথে সংসারের সব কাজ দুজনে ভাগ করে নিতে হবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও সঙ্গীর কাজের প্রশংসা করতে হবে।

সর্বোপরি, ভিভোর্সের ভাবনা থেকে বিরত থাকতে হবে। অধিকন্তু, বৈবাহিক সম্পর্কের মূলভিত্তি হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সম্ভাষণ ও সুক্ষ্ম সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশ। সুতরাং, আপনার সঙ্গীকে আপনার হৃদয়ের একান্ত অনুভূতিগুলো জানিয়ে দিন। দিনশেষে অন্তত একবার তাকে বলুন- ‘ভালোবাসি তোমাকে এবং তুমি আমার আমৃত্যুর গর্বিত সঞ্চয়’।
শেষে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূল্যবান উক্তির সাথে একাত্মতা পোষণ করে বলতে চাই- ‘দাম্পত্যটা সত্যিই একটি আর্ট। প্রতি মুহূর্তেই তাই একে আবিষ্কার করতে হবে, লালন করতে হবে, আর উপলব্ধি করতে হবে নিত্য। আর তবেই না পান করা যাবে দাম্পত্যের স্বর্গীয় সুধা।

 

 

 

 

 

মুক্তকন্ঠ২৪

নিয়মিত সকল সংবাদ পেতে মুক্তকন্ঠ২৪.কম এর ফেইসবুকে যুক্ত থাকুন।

শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *