বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম :
হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের ক্ষমার জন্য ঘুষ: যুক্তরাষ্ট্রে তদন্ত শুরু আমাদের গুরুদায়িত্ব ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করা: মেয়র তাপস এরদোয়ান ঢাকা সফরে সম্মতি দিয়েছেন ৬১ পৌরসভা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা: নির্বাচন কমিশন শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম পরিদর্শন করলেন ক্যারিবীয় প্রতিনিধি দল হোয়াটমোরের সেরা টেস্ট একাদশে সাকিব আল হাসান লিভারপুল গ্রুপ সেরা হয়ে শেষ ষোলোতে  বীর মুক্তিযোদ্ধা আতিক উল্ল্যাহ হত্যা মামলায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশ আগামী বছর আয়োজন করবে ‘বিশ্ব শান্তি সম্মেলন’   বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য আঙ্কারায় এবং ঢাকায় হবে আতাতুর্কের ভাস্কর্য  দুর্যোগে বিএনপির ভূমিকা কী, জাতি জানতে চায়: ওবায়দুল কাদের করোনাভাইরাস : দেশে আরও ৩৮ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ২১৯৮ বিশ্বের প্রথম যুক্তরাজ্যে করোনার টিকার অনুমোদন নভেম্বরেও ৪১ শতাংশ বেড়েছে রেমিট্যান্স দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বব্যাপী করোনায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে হতদরিদ্র : জাতিসংঘ বিদ্যা ফিরিয়েছেন মন্ত্রীর আমন্ত্রণ, সিনেমার শুটিং গেলো আটকে বাংলাদেশে ম্যারাডোনাকে নিয়ে গান আমিরের সঙ্গে তর্কে জড়ানোয় আফ্রিদি শাসালেন আফগান পেসারকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: ভারত থেকে সরে যেতে পারে 

প্রকৃতি প্রেমী পর্যটকদের পদচারনায় মুখরিত লক্ষ্মীপুরের মেঘনা উপকূল

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুরঃ

 

মেঘনার রূপ-রস-সৌন্দযের্র লীলাভূমি মেঘনা পাড়ের এ উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর। নদী আর প্রকৃতি দুই মিলে লক্ষ্মীপুরের মেঘনার উপকূলকে করে তুলেছে অপরূপ। ফলে প্রতিদিন এ জেলার পুরো উপকূল হয়ে উঠছে প্রকৃতি প্রেমী মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাই প্রতিনিয়ত পর্যটকদের পদচারনায় মুখরিত থাকে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর উপকূল।

মেঘনাপাড়ের এ জেলায় রয়েছে জেগে ওঠা অনেক চর, ঢেঁউ আর বেলাভূমির মিতালী। রয়েছে ইলিশের দীর্ঘতম অভয়াশ্রম। মেঘনার বুক চিড়ে পণ্যবাহী সারি-সারি লাইটারেজ জাহাজ, মাছ শিকারি ছোট, বড় পালতোলা নৌকার দোলা আর নারকেল-সুপারির সাজানো বাগান। রয়েছে ৩’শ বছরের পুরানো ঐতিহ্য বাহী দালাল বাজারের জমিদার বাড়ি।

সয়াবিন ও ধানসহ ফসলের বিস্তৃর্ণ মাঠ। নদীর চরে রয়েছে গরু-মহিষ, ভেড়া। তাদের সঙ্গে রাখালের বন্ধুত্ব। মেঘনা নদী ছাড়াও ভূলুয়া নদী এবং ডাকাতিয়া ও রহমতখালী খাল, রহমতখালী খাল পাড়ে রয়েছে মনোরম পৌর শিশু পার্ক। উপকূল জুড়ে এ সৌন্দর্যের লীলাভূমি, তাই অনায়াসেই এখানে ছুটে আসেন পর্যটকেরা। ঢল নামে সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের।

সদর, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার এসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবস্থিত। দিন-দিন মেঘনার এই উপকূলকে ঘিরে দেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে উঠছে।

উপকূলের অন্যতম পর্যটন স্পট চর আলেকজান্ডার। মেঘনার চর আলেকজান্ডারে জোয়ার-ভাটার খেলা চলে নিত্য। মেঘনার উঁচু ঢেঁউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জেলেরা শিকার করেন রূপালী ইলিশ। রামগতি উপজেলায় মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে আলেকজান্ডার পৌর শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মেঘনা নদী। উপজেলা পরিষদ থেকে মাত্র একশ গজ দূরত্বে ভাঙনরোধে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। বেড়ী বাঁধ এলাকা এখন অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন উৎসব কেন্দ্রিক ছুটির দিন গুলোতে এ এলাকায় দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। দেশের নানান প্রান্ত থেকে আসেন পর্যটকেরা। এছাড়াও লক্ষ্মীপুরের হাজারো মানুষ প্রতিনিয়ত ছুটে যান সেখানে। আর ঈদ এলে তো প্রতিনিয়ত লোখো দর্শনার্থীর আগমন ঘটে এই বাঁধে। প্রায় চার কিলোমিটার পাথরের বেড়ী বাঁধ থেকে মেঘনার পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখা যায়। এখান থেকে নদী এবং তীর সংলগ্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অপার লীলা উপভোগ করা যায়। এখানে আগত দর্শনার্থীরা এটাকে মিনি কক্সবাজার বলে থাকেন, তাদের ভাষায় এ যেন আরেক কক্সবাজার। ছুটি কিংবা অনন্যা দিন ওই বাঁধে ঢল নামবে সৌন্দর্য পিপাসু হাজার-হাজার মানুষের।

এছাড়া মেঘনা নদীর তীরে রামগতির চরগাজী ইউনিয়নের তেগাছিয়া বাজার স্লুইস গেট থেকে উপভোগ করা যায় সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য। এখানে রয়েছে ৩০ হাজার ঝাউগাছের গভীর বন। ফলে ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে এটি অন্যতম বিনোদন স্পট। প্রায় সারা বছরই এখানে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বনভোজন ছাড়াও সাধারণ মানুষের আনাগোনো থাকে।

মতিরহাটও জেলার আরেক দর্শনীয় স্থান। এটি দেশের সর্ববৃহৎ মাছ ঘাটগুলোর অন্যতম। এখানে রয়েছে মেঘনা নদীর বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সমারোহ। প্রতিদিন অন্তত কোটি টাকার ইলিশ কেনা-বেচা হয় এ ঘাটে।
এখানকার চরে রয়েছে শত-শত মহিষের পাল। পাওয়া যায় মহিষের দুধের ঐতিহ্যবাহী ছানা ও দই। মতিরহাট রক্ষায় ব্লক দিয়ে বাঁধ দেওয়ায় পলি জমে বেলাভূমির সৃষ্টি হয়েছে। পাশেই জেগে উঠেছে নতুন চর। ফলে ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে ওই চরে ভিড় জমায় ভ্রমণপ্রেমীরা।

জেলা শহর থেকে মাত্র ১২ কিঃমিঃ দূরে মেঘনা নদীর পাড়ে মজুচৌধুরীর হাট। এখানে রয়েছে দুটি স্লুইস গেট। স্লুইস গেট থেকে উপভোগ করা যায় নদীর মনোরম দৃশ্য। প্রতিদিন জেলা শহর থেকে শত-শত মানুষ ভিড় করে এখানে। জেলেদের মাছ ধরা আর মানতা সম্প্রদায়ের নৌকার সারি, ঘাটে মাছের বেছা-কিনা উপভোগ করেন আগত দর্শনার্থীরা।

এছাড়া পৌর শহরে অবস্থিত ৩’শ বছরের পুরানো ঐতিহ্য বাহী দালাল বাজারের জমিদার বাড়ি। লক্ষ্মীপুরের অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা দালাল বাজারের জমিদার বাড়ি। জমিদার বাড়িটি দর্শনার্থীদের দারুন আকর্ষনের জায়গা। কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে ৩’শ বছরের পুরোনো দালাল বাজার জমিদার বাড়ি। দালাল বাজারের পাশেই ১৪ একর সম্পত্তিতে রয়েছে পরিত্যক্ত্য রাজ গেট, জমিদার প্রাসাদ, অন্দর মহল, শান বাঁধানো ঘাট, জমিদার বাড়ির প্রাচির, নির্মাণ সামগ্রী, বিশেষ করে কয়েক টন ওজনের লোহার বিম, বিরাট আকার লোহার সিন্দুক, নৃত্যশালা, বহিরাঙ্গন, চারটি পুকুর। সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়িটি দেখলে জমিদারের নান্দনিক রুচির পরিচয় পাওয়া যায়।
সাড়ে সাত একর জমির উপর তৈরি বাড়িটির বেতরে চারটি পুকুর, সাতটি ভবন ও একটি বিশাল বাগান রয়েছে। চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো সুন্দর এই জমিদার বাড়ির সামনে ২২ একর জমির উপর রয়েছে খোয়াসাগর দিঘি। শীতকালে এ দিঘিতে অতিথি পাখির কলোতানে দৃষ্টি কাড়ে সবার। জমিদার রাজ ব্রজবল্লব রায় মানুষের পানির চাহিদা মিটাতে দিঘিটি খনন করেন। এই দিঘি নিয়ে নানান কল্পকাহিনীও প্রচলিত আছে। খোয়াসাগর দিঘির পাশে রয়েছে প্রায় ২শ’ বছরের পুরানো চারটি মঠ।

 

জানা গেছে, ২০১৫ সালে দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়াসাগর দিঘি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক। তবে স্থানীয় একটি মহল উচ্চ আদালতে রিট করলে উদ্যোগটি ভেস্তে যায়। দীর্ঘদিন ধরে ওই মহল বিভিন্নভাবে জমিদার বাড়ি ও দিঘিটি ভোগদখল করে আসছিল।

সর্বশেষ গত বছরের ২৯ আগস্ট আদালত ‘জমিদার বাড়ি ও খোয়াসাগর দিঘি’ সংক্রান্ত রিটটি খারিজ করে দেন। এরপরই বর্তমান জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পাল এর উদ্যোগে প্রাচীন এ দুটি নিদর্শনের সংস্কার ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ শুরু হয়। এদিকে প্রত্মতাত্ত্বিক অধিদফতর ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি দালাল বাজার জমিদার বাড়ি সংক্রান্ত একটি গেজেট প্রকাশ করে। সেখানে ঐতিহাসিক নিদর্শন বিবেচনা করে দালাল বাজার জমিদার বাড়িকে সংরক্ষণযোগ্য ভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে লক্ষ্মীপুর জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন শিল্প উন্নয়নে ঐতিহ্যবাহী দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়াসাগর দিঘিকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর ও পর্যটন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে। এই স্থাপনাগুলোকে কেন্দ্র করে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর ও পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর।

 

 

 

কীভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য গাড়ি লক্ষ্মীপুরে আসে। এর মধ্যে ইকোনো বাস সার্ভিস, ঢাকা এক্সপ্রেস, জোনাকী সার্ভিস নন এসি ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা। রয়েল কোচ ও মিয়ামি এয়ারকন এসি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। আলেকজান্ডার ও মতির হাট যেতে ঢাকা থেকে এসে শহরের ঝুমুর সিনেমা হলের সামনে নামতে হবে। পরে লোকাল বাস ও সিএনজি চালিত অটোরিকসায় করে আলেকজান্ডার ও মতির হাট যাওয়া যাবে। মজুচৌধুরীরর হাট ও দালাল বাজারের জমিদার বাড়ি যেতে ঢাকা থেকে এসে শহরের উত্তর তেমুহনী এলাকায় নামতে হবে। পরে সিএনজি চালিত অটোরিকসায় করে মজুচৌধুরীরর হাট ও দালাল বাজারের জমিদার বাড়ি যাওয়া যাবে।

 

 

টিপস:
লক্ষ্মীপুর জেলা শহরে রাতের বেলা থাকার অসংখ্য হোটেল রয়েছে। দিনের বেলায় আবহাওয়া বুঝে ছাতা নিয়ে বের হবেন। এ সব দর্শনীয় স্থান চারদিকে খোলামেলা হওয়ায় দুপুরে এখানে প্রচন্ড গরম থাকে। আলেকজান্ডার ও মতিরহাট বাজার থেকে খাটি মহিষের দই ক্রয় করতে পারেন। আর এই দুই স্থান থেকে রূপালী ইলিশসহ নদীর হরেক রকমের মাছ ক্রয় করতে পারবেন। মজুচৌধুরীর হাট ও দালাল বাজারে জমিদার বাড়ির আশ পাশ থেকে ছানা ও মিষ্টি ক্রয় করতে পারবেন। আলেকজান্ডার, মতির হাট ও মজুচৌধুরীর হাট এলাকায় নৌকায় করে মেঘনা নদী ঘুরে দেখবেন। প্রতি ঘন্টা নৌকা ভাড়া ৩০০-৫০০ টাকা।

 

 

শেয়ার করুন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *