মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০২২, ০৫:০৯ অপরাহ্ন

যে কারণে গম রপ্তানি বন্ধ করলো ভারত

রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে ভারত চলতি বছরে প্রায় ১০ মিলিয়ন টন গম রপ্তানির লক্ষ্য স্থির করেছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন চলমান সংঘাতে বিশ্ববাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার পূর্ণ সুযোগ হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল দেশটি। চলতি বছর ভারত গম রপ্তানি কমানোর ওপর নজর দিতে পারে, এমন ঘোষণার মাত্র দুইদিন পরেই অবিলম্বে গম রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

শুক্রবার (১৩ মে) ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তরে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভারত সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে এবং অন্যান্য দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রয়োজন ও তাদের সরকারের অনুরোধের ভিত্তিতে গম রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে। এছাড়া, ইতোমধ্যে লেটার অব ক্রেডিট ইস্যুকৃত দেশগুলোতেও গম রপ্তানি করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী গমের মূল্যবৃদ্ধি ভারত এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি দুর্বল দেশগুলোর খাদ্য নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাওয়া, সেইসঙ্গে গমের মূল্য আরও বৃদ্ধি পেতে পারে, এই আশঙ্কায় রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম উৎপাদনকারী দেশ ভারত।

তীব্র দাবদাহে বেহাল দশা ভারতের
বর্তমানে ভারতজুড়ে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। মধ্য ভারতের সাড়ে ১০ লাখ জনবসতির রাজগড় শহরে সম্প্রতি সর্বোচ্চ সাড়ে ৪৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা উঠতে দেখা গেছে। এর আশেপাশের অন্যান্য ৯টি শহরের কোনোটির তাপমাত্রাই এ সময় ৪৫ ডিগ্রির নিচে ছিলনা।

এমনকি উচ্চ তাপমাত্রার কারণে যত্রতত্র আগুন লাগার ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে দেশটিতে। সম্প্রতি রাজধানী নয়াদিল্লিতে তীব্র দাবদাহে বিশাল এক আবর্জনার স্তূপে আগুন লেগে যায়। এ ব্যাপারে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ু বিজ্ঞানী ফ্রিডরিক অটো বলেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের আগে প্রতি ৫০ বছরে একবার এ ধরনের তাপপ্রবাহের ঘটনা ঘটতে দেখা যেত। আর এখন এটি ঘটছে প্রতি ৪ বছরে একবার।

বয়স্ক ও দরিদ্র মানুষ, যারা তাপপ্রবাহের সরাসরি শিকার হতে পারে এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক বেশি ভারতে; আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুসারে, বিশ্বের এমন শীর্ষ ৫ দেশের তালিকায় রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত। দ্য ল্যানসেটের ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভারতে দাবদাহের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে অন্তত ১৫ শতাংশ। ব্রাজিলের পাশাপাশি ভারতেও তাপজনিত মৃত্যুর হার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি।

এদিকে, চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা তাপজনিত অসুস্থতার বিষয়ে ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছেন। তাদের বিশ্বাস, উচ্চ তাপমাত্রা কোভিড-১৯ এর চতুর্থ তরঙ্গের চেয়েও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

১৯০১ সালে তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে চলতি বছরের মার্চই ছিল ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তপ্ত মার্চ। মূলত মার্চের দিকেই গম তোলার সময় হয় এবং তখন তাপের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এই ফসল। আর এ কারণেই এবার ফসল কাটা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন ভারতের কৃষকরা।

পাঞ্জাবের কৃষক বলদেব সিং চোখের সামনেই নিজের ফলানো ফসল নষ্ট হতে দেখেছেন। বলদেবের মতে, এ বছর শীত যাওয়ার পর, বসন্ত অন্যবারের মতো শীতল ছিলনা; গ্রীষ্মের মতোই তীব্র গরম পড়েছে এবার। আর এর প্রভাবেই পাঞ্জাবের কৃষক তার ফলনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হারিয়েছেন। রাজ্যের অন্য কৃষকরা ক্ষতির শিকার হয়েছেন আরও বেশি।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গম উৎপাদক ভারত ঐতিহ্যগতভাবেই উৎপাদনের কিছু অংশ রপ্তানি করে থাকে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক ঘাটতি দেখা দিলে রপ্তানি বাড়িয়ে, বর্ধিত দামে ফসল বিক্রি করে তা থেকে লাভবান হওয়ার পরিকল্পনা করেছিল দেশটি। কিন্তু তীব্র দাবদাহে ভাটা পড়েছে সেই পরিকল্পনায়। চণ্ডীগড়ের কৃষি বিশেষজ্ঞ দেবিন্দর শর্মা বলেন, গম রপ্তানি করে বিশ্ববাজার থেকে এখন মুনাফার আশা করলে অভ্যন্তরীণ যোগানের ওপর তা মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।

মূলত এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে গম রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

ইউক্রেন সংঘাতের কারণেই ভারতের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে গম ক্রেতারা

ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন বিশ্বব্যাপী কৃষি বাজারকে অস্থিতিশীল করার কারণেই গম ক্রেতাদের ভারতের দিকে ঝুঁকতে দেখা গেছে।

ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের আগে বিশ্বব্যাপী গম ও বার্লি রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হতো ওই দুই দেশ থেকে। সংঘাত শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের বন্দরগুলো অচল হয়ে পড়ায় বিশ্বের খাদ্যশস্য সরবরাহ চেইনে পড়েছে বড় ধরনের প্রভাব। খাদ্যশস্য সংকটের পাশাপাশি বেড়েছে জ্বলানি এবং ভোজ্যতেলের দামও।

রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আগে ভারত চলতি বছরে প্রায় ১০ মিলিয়ন টন গম রপ্তানির লক্ষ্য স্থির করেছিল। চলমান সংঘাতে বিশ্ববাজারে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার পূর্ণ সুযোগ হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল দেশটি। তবে সংকট পুঁজি করে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়া অঞ্চলে গমের নতুন বাজার খুঁজে বের করার এই পরিকল্পনা শেষপর্যন্ত ভেস্তে গেছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.