বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন

আফসোস, চাটার দল এখনো বঙ্গবন্ধুকে তাড়া করে চলেছে

বঙ্গবন্ধু’র বায়োপিক নিয়ে আমার ভবিষ্যদ্বাণী ট্রেইলারেই মিলে গিয়েছে। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলাটা আত্মহননের শামিল, ক্যারিয়ার ধ্বংস হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় -আমি যদি যেকোন অন্যায়ে নিরব থাকি , মহাকাল আমায় ক্ষমা করবে না।
বঙ্গবন্ধু কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, বঙ্গবন্ধু ১৭ কোটি বাঙ্গালীর। নাম দিয়েছেন “মুজিব – The Making of a nation”। একটি জাতির গঠন প্রক্রিয়া’র এতোটা দৈন্য দশার দূর্বল চলচ্চিত্রায়ন কেন আমাদের ইতিহাসের বাক্সে জমা রাখতে হবে!

ভৌগলিক সীমারেখা’র হিসাবে বাংলাদেশ অতি ক্ষুদ্র এক দেশ। সেই দেশে ঐতিহাসিক চরিত্রের সংখ্যাও নগণ্য। সেই নগণ্য ঐতিহাসিক চরিত্রের মধ্যে বঙ্গবন্ধু আমাদের মাথার তাজ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গত এক যুগ ধরে সচেতন ভাবে একটিও আবেগের কথা বলিনি। চারিদিকে ক্রমবর্ধমান চেতনা বাণিজ্য এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত্রতত্র আবেগের কেনাবেচা দেখে এক ধরণের বিবমিষা কাজ করাতে এসব বিষয় এড়িয়ে চলেছি । কিন্তু মশকরার একটা সীমা তো থাকা উচিত! জাতির জনক শব্দটা কী একটা মুখের কথা!

ট্রেইলারে প্রতিটি চরিত্রকে কমিক বুকের চরিত্র মনে হয়েছে। কেবল বঙ্গবন্ধু একা নন , জাতীয় চার নেতার মত বঙ্গবন্ধুর অজস্র ঘনিষ্ট সহচরের কারো ব্যক্তিত্ব’র সাথে একটি চরিত্রও কী গিয়েছে? প্রত্যেকটি চরিত্রকে মনে হয়েছে মুল চরিত্রের ব্যাঙ্গচিত্র! বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত যেকোন কিছুরই একটা দালিলিক মুল্য রয়েছে, সেটা যেমন তেমন করে বানানো আসলে যায় না। বঙ্গবন্ধু মানেই একটা স্বাধীন সার্বভৌম জাতি, সেটাকে এতোটা খেলোভাবে উপস্থাপনের কোন সুযোগ নেই আসলে।

কেন চরিত্রগুলোকে কমিক বুকের চরিত্র মনে হলো? যাদেরকে নেওয়া হয়েছে তাঁদের প্রতি পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলছি, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে সংগ্রামী মানুষের গভীরতা সম্ভবত নেই। বঙ্গবন্ধু যতটা পথ শুধু পায়ে হেঁটেছেন, যতবছর জেল খেটেছেন সেটা কেবলমাত্র প্রস্থেটিক দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়, যিনি সেই চরিত্রটি রূপায়ণ করবেন তার নিজের ব্যক্তিত্বে এর ছিটেফোটা গভীরতা থাকতেই হবে।

যিনি এমন একটি চরিত্র করবেন তাঁর অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পিকেটিংয়ের অভিজ্ঞতা বা বিভিন্ন পাঠ চক্রের সদস্য হবার অভিজ্ঞতার বেশী দরকার ছিল।

বঙ্গবন্ধু চরিত্র যিনি করেছেন তাঁর তো বছর খানিক টুঙ্গিপাড়াতেই কাটিয়ে আসা উচিৎ ছিল। ১ টাকা সম্মানী না নিয়ে ১ কোটি টাকা সম্মানী নিয়ে টুঙ্গি পাড়া, আগরতলা, ঢাকা, বেকার হোস্টেল, করাচী, লাহোর সবখানে কিছুদিন করে অন্তত বসবাস করা দরকার ছিল। বঙ্গবন্ধু পায়ে হেটে, ট্রেনে বা নৌকায় চেপে ৫৬ হাজার বর্গমাইল ঘুরেছেন, এই নায়ককে আধুনিক পরিবহনে করে হলেও এই ৫৬ হাজার বর্গমাইল ঘুরতে হত। এসব ব্যার্থতার দায় অভিনেতার ততটা নয় আসলে, বহুলাংশেই এই দায় এর সাথে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের ।

গোটা ট্রেইলার নিয়ে ইতিমধ্যেই বিস্তর সমালোচনা চলছে, আমি আর নতুন করে সেই সমস্ত ডিটেইলে গেলাম না। কিন্তু ৭ই মার্চের ভাষণ পৃথিবীতে একবারই হয়, সেটার চলচ্চিত্রায়ন ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটের সাবধানতা নিয়ে হওয়া উচিত ছিল। এই ভাষণের এতোবড় দালিলিক প্রমাণ থাকা সত্বেও কেন আমাদেরকে ভুলভাল ওয়্যারলেস মাইক্রোফোন দেখতে হলো! কেন বঙ্গবন্ধু চরিত্র রুপায়নকারীকে দেখে মনে হল তিনি এক্ষুনি বাতাসে উড়ে যাবেন! কেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দরাজ ব্যারিটোন কন্ঠস্বরকে এমন চিনচিনে পাতলা কন্ঠরস্বর দিয়ে উপস্থাপন করা হল! যেই ভাষণ দেখে এখনো রক্ত গরম হয়ে যায়, কেন সেই ভাষণের চলচ্চিত্রায়ন দেখে রক্ত বরফশীতল হয়ে গেল!

ভাল অথবা মন্দ, যেকোন চলচ্চিত্রই এক ধরনের সাইকলোজক্যাল ইমপ্যাক্ট ফেলে। ৭ই মার্চের ভাষণ, স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভাষণ, জাতিসংঘের ভাষণ বা তার আগে পাইপের আগুন ধরাতে ধরাতে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের বঙ্গবন্ধু এতোটাই লার্জার দ্যান লাইফ, তাঁকে এতোটা স্মলার দ্যান লাইফ হিসাবে উপস্থাপনের সুযোগ একেবারেই নেই। সেটার সাইকলোজিক্যাল ইমপ্যাক্ট ভয়াবহ।

বঙ্গবন্ধু নিজেই আক্ষেপ করে বলতেন – “যেদিকেই তাকাই, সেদিকেই দেখি শুধু চাটার দল’ এই চাটার দল এখনো বঙ্গবন্ধুকে তাড়া করে চলেছে, এটাই আফসোস।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *